১৬০০ মানুষের গল্প, আমার পথচলার গল্প

 আহানাফ হাসান সোহাম 

আজ ময়মনসিংহে বসে যখন গত ১৫ মাস ৯ দিনের পথচলার দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়—এই সময়টা শুধু আমার পেশাজীবনের একটি অধ্যায় নয়, বরং অসংখ্য মানুষের জীবন, আশা, সংগ্রাম আর ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য যাত্রা।

যেদিন অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্রে আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, সেদিন জানতাম না সামনে কত শত পরিবারের গল্প শুনব, কত শিশুর ছোট ছোট অর্জনের সাক্ষী হব, আর কত বাবা-মায়ের চোখে হতাশার জায়গায় আশার আলো দেখতে পাব।

প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ এসেছে। কেউ এসেছে সন্তানের প্রথম শব্দের অপেক্ষা নিয়ে, কেউ ভাষা বিকাশের সমস্যায় উদ্বিগ্ন হয়ে, কেউ অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, শ্রবণ বা বাক্-ভাষা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে। প্রতিটি পরিবারের গল্প ছিল ভিন্ন, কিন্তু তাদের স্বপ্ন ছিল এক—একটু উন্নতি, একটু সম্ভাবনা, একটু আশার আলো।

এই দীর্ঘ পথচলায় আমি উপলব্ধি করেছি, চিকিৎসা শুধু পরামর্শ দেওয়া নয়। কখনো একজন উদ্বিগ্ন অভিভাবকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, কখনো সঠিক তথ্য দিয়ে তার ভরসার জায়গা তৈরি করা, কখনো বা একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের লড়াইয়ে সঙ্গী হওয়াও চিকিৎসারই অংশ।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ এই ময়মনসিংহ বিভাগে আমার কনসালট্যান্সি সংখ্যা ১৬০০ জনে পৌঁছেছে।

সংখ্যাটা হয়তো কেবল একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু আমার কাছে এই ১৬০০ মানে ১৬০০টি পরিবারের বিশ্বাস, ১৬০০টি স্বপ্ন, ১৬০০টি সংগ্রামের গল্প এবং ১৬০০ বার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ।

আমি জানি, সব সমস্যার সমাধান আমি দিতে পারিনি। কিন্তু প্রতিটি মানুষকে আন্তরিকভাবে সময় দেওয়ার, তাদের কথা শোনার এবং আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। কারণ একজন স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ডিগ্রি নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস।

আজকের এই অর্জন কোনো একার সাফল্য নয়। এর পেছনে রয়েছে আমার শিক্ষক, সহকর্মী, পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সর্বোপরি সেই সব বাবা-মা ও পরিবার, যারা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। তাদের বিশ্বাসই আমাকে প্রতিদিন আরও দায়িত্বশীল, আরও মানবিক এবং আরও নিবেদিত হতে শিখিয়েছে।

এই ক্ষুদ্র জীবনে ১৬০০ জন মানুষের কাছে বিনামূল্যে সেবা প্রদান করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য শুধু একটি পেশাগত মাইলফলক নয়; এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি, বড় সম্মান এবং বড় দায়িত্ব।

আল্লাহর কাছে শুধু একটি প্রার্থনা—যেন ভবিষ্যতেও আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, আরও বেশি শিশুর হাসির কারণ হতে পারি, এবং আমার জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারি। আলহামদুলিল্লাহ।

১৫ মাস ৯ দিনের পথচলায় ১৬০০ জন মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। এই অর্জনই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লেখক : (শ্রবণ, বাক্ ও ভাষা বৈকল্য বিশেষজ্ঞ), কনসালটেন্ট স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অটিজম এনডিডি সার্ভিস সেন্টার ময়মনসিংহ।

     এ বিভাগের আরো সংবাদ